দলিল রেজিস্ট্রি করতে কি কি কাগজপত্র লাগে – সম্পূর্ণ তালিকা ২০২৬
বাংলাদেশে জমি কেনাবেচা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো দলিল রেজিস্ট্রি। রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে যদি দেখা যায় কোনো একটি কাগজপত্র বাদ পড়েছে, তাহলে পুরো কাজ আটকে যায়। তাই দলিল রেজিস্ট্রি করতে কি কি কাগজপত্র লাগে – এই প্রশ্নের উত্তর আগেভাগে জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই আর্টিকেলে ২০২৬ সালের সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হয়েছে।
দলিল রেজিস্ট্রি কেন করতে হয়?
সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে Registration Act, 1908 অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রি না হলে জমির মালিকানা আইনগতভাবে প্রমাণ করা কঠিন এবং পরবর্তীতে নামজারি বা খারিজও করা সম্ভব হয় না।
দলিল রেজিস্ট্রি করতে কি কি কাগজপত্র লাগে – এর মূল তালিকা
বিভিন্ন ধরনের দলিলের জন্য কাগজপত্রের ধরন কিছুটা ভিন্ন হয়। তবে নিচে সাধারণভাবে সব ধরনের দলিল রেজিস্ট্রিতে যেসব কাগজপত্র দরকার হয়, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো।
১. পাসপোর্ট সাইজ ছবি
ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিতে হবে। পুরানো ছবি বা স্ট্যাম্প সাইজের ছবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে প্রতিষ্ঠানের (কোম্পানির) ক্ষেত্রে ছবির প্রয়োজন নেই।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) / পাসপোর্ট / জন্মসনদ
ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অপরিহার্য। NID না থাকলে বৈধ মেয়াদের পাসপোর্ট গ্রহণযোগ্য। মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট চলবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে (যেমন নাবালকের জন্য) জন্মসনদ ব্যবহার করা যাবে।
৩. জরিপ খতিয়ান
দলিলের তফসীলে যে জরিপ খতিয়ান উল্লেখ থাকবে সেটার কপি দিতে হবে। বাংলাদেশে প্রচলিত জরিপ খতিয়ানগুলো হলো – CS, SA, RS, BS, দিয়ারা এবং সিটি জরিপ খতিয়ান। অনলাইনে dlrms.land.gov.bd থেকে এই খতিয়ানের কপি তোলা যায়।
৪. নামজারি / খারিজ খতিয়ান
সম্পত্তির নামজারি (Mutation) করা থাকলে সেই খতিয়ানের কপিও দলিল রেজিস্ট্রির সময় সাথে রাখতে হবে।
৫. বায়া দলিল
বিক্রেতা যেসব দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জন করেছেন, সেই সকল পূর্ববর্তী দলিলের মূল কপি অথবা সার্টিফাইড কপি (নকল) দিতে হবে। এটিকেই বায়া দলিল বলা হয়।
৬. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর ৬(৩) ধারা অনুযায়ী, জমি বিক্রয়, দান বা যেকোনোভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (পূর্বে খাজনা নামে পরিচিত) পরিশোধের রশিদ বাধ্যতামূলক। অনলাইনে lsg-land-owner.land.gov.bd থেকে এই কর পরিশোধ করা যায়।
৭. মৌজা ম্যাপ / নকশা
দলিলের তফসীলে, চৌহদ্দিতে বা হাত নকশায় যদি রাস্তার উল্লেখ থাকে, তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে বিক্রেতা নিজে ওই রাস্তা নির্মাণ করেননি। এই প্রমাণের জন্য মৌজা ম্যাপ দরকার হয়।
৮. পিএসআর (PSR) বা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণক
আয়কর আইন, ২০২৩ এর ২৬৪(২) ধারা অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বা পৌরসভার অধীনে যেকোনো মূল্যের দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে পিএসআর বা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণক দিতে হবে। এই প্রমাণকে থাকবে করদাতার নাম, TIN এবং কর বর্ষ। etaxnbr.gov.bd থেকে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা যায়।
৯. ওয়ারিশ সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ হিসেবে কেউ সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ইস্যু করা ওয়ারিশ সনদ অবশ্যই সাথে রাখতে হবে।
১০. পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্য কেউ দলিল সম্পাদন করতে চাইলে রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল থাকা বাধ্যতামূলক।
বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র
কিছু বিশেষ ধরনের দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে উপরের তালিকার বাইরে আরও কিছু নথি প্রয়োজন হয়:
কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে:
- মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (সর্বশেষ কপি)
- পরিচালনা পর্ষদের রেজুলেশন
- প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাপত্র
রাজউক / গণপূর্ত / গৃহায়ণ / বেজা / বিসিক এর জমির ক্ষেত্রে:
- চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র
- হস্তান্তরের অনুমতিপত্র
ব্যাংক বন্ধক দলিলের ক্ষেত্রে:
- ঋণ মঞ্জরীপত্র (ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত)
কোম্পানি কর্তৃক কৃষি জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে:
- রাজস্ব কর্তৃপক্ষ বা কালেক্টরের পূর্বানুমতিপত্র (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯০ ধারা অনুযায়ী)
আপনার TIN সার্টিফিকেট কখন লাগবে?
সিটি কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বা জেলা সদরের পৌরসভার অধীনে এক লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের e-TIN সার্টিফিকেট লাগবে। হেবা বা দানের ক্ষেত্রে TIN বাধ্যতামূলক নয়।
দলিল রেজিস্ট্রির আগে ক্রেতার যা করণীয়
দলিল রেজিস্ট্রির আগে ক্রেতাকে বিক্রেতার কাছ থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যাচাই করে নেওয়া উচিত:
১. মালিকানা যাচাই করুন – বায়া দলিল ও খতিয়ান মিলিয়ে দেখুন বিক্রেতা প্রকৃত মালিক কিনা।
২. ভূমি উন্নয়ন কর চেক করুন – হালনাগাদ কর পরিশোধ হয়েছে কিনা নিশ্চিত করুন।
৩. নামজারি দেখুন – জমিটি বিক্রেতার নামে নামজারি হয়েছে কিনা যাচাই করুন।
৪. মামলা আছে কিনা খোঁজ নিন – সংশ্লিষ্ট আদালতে ওই জমি নিয়ে কোনো মামলা চলছে কিনা দেখে নিন।
যদি কাগজপত্র বিষয়ে ভালো ধারণা না থাকে, তাহলে একজন সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক বা অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: জমি রেজিস্ট্রির সময় কি ক্রেতাকে উপস্থিত থাকতে হবে?
উত্তর: ক্রেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। তবে দলিলে সংযুক্ত ছবিতে টিপসই ও স্বাক্ষর দলিল প্রস্তুতির সময় করে রাখলে রেজিস্ট্রির দিন উপস্থিত না থাকলেও চলে।
প্রশ্ন: পুরানো পাসপোর্ট দিয়ে কি দলিল রেজিস্ট্রি হবে?
উত্তর: না। মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট গ্রহণযোগ্য নয়। বৈধ মেয়াদের পাসপোর্ট অথবা NID বা জন্মসনদ দিতে হবে।
প্রশ্ন: গ্রামের জমিতে কি TIN লাগবে?
উত্তর: সিটি কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বা পৌরসভার বাইরের (ইউনিয়ন পর্যায়ের) জমির ক্ষেত্রে TIN বাধ্যতামূলক নয়।
প্রশ্ন: হেবা দলিলে কি TIN লাগবে?
উত্তর: না, হেবা বা দানের ক্ষেত্রে TIN বাধ্যতামূলক নয়।
প্রশ্ন: দলিল রেজিস্ট্রির পর কি নামজারি করতে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ। দলিল রেজিস্ট্রির পর সম্পত্তি নিজের নামে নামজারি (Mutation / খারিজ) করা অত্যন্ত জরুরি। এটি না করলে সরকারি রেকর্ডে মালিকানা পরিবর্তন হবে না।
সংক্ষিপ্ত চেকলিস্ট
দলিল রেজিস্ট্রির দিন রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার আগে নিম্নের সব কাগজপত্র আছে কিনা যাচাই করুন:
- ক্রেতা-বিক্রেতার সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- ক্রেতা-বিক্রেতার NID / পাসপোর্ট / জন্মসনদ
- জরিপ খতিয়ানের কপি (CS / SA / RS / BS যেটি প্রযোজ্য)
- নামজারি / খারিজ খতিয়ানের কপি
- বায়া দলিলের মূল কপি বা সার্টিফাইড নকল
- হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ
- মৌজা ম্যাপ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- পিএসআর / রিটার্ন দাখিলের প্রমাণক (পৌরসভা / সিটি কর্পোরেশন এলাকায়)
- ওয়ারিশ সনদ (মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির ক্ষেত্রে)
- TIN সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
শেষ কথা
দলিল রেজিস্ট্রি করতে কি কি কাগজপত্র লাগে তা আগে থেকে জেনে প্রস্তুতি নিলে সময় ও ঝামেলা দুটোই বাঁচে। ২০২৬ সালের আইন অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ এবং পৌরসভা এলাকায় PSR দাখিলের প্রমাণক এখন বাধ্যতামূলক – এই দুটো নতুন সংযোজনের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার অফিস অথবা অভিজ্ঞ দলিল লেখকের সহায়তা নিন।
