অনলাইনে সার্ভে খতিয়ান বের করার নিয়ম ২০২৬
জমি কেনার সময় বা মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে “সার্ভে খতিয়ান কোনটা লাগবে” – এই প্রশ্নে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন। CS, SA, RS, BS – এত ধরনের খতিয়ানের নাম শুনে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। ২০২৬ সালে এসে সুখবর হলো, সার্ভে খতিয়ান এখন অনলাইনেই যাচাই ও সংগ্রহ করা যায়, এবং কোনটা কোন সময়ের রেকর্ড তা বোঝাও আগের চেয়ে সহজ হয়ে গেছে।
এই আর্টিকেলে সার্ভে খতিয়ানের প্রকারভেদ, প্রতিটির পার্থক্য এবং dlrms.land.gov.bd থেকে অনলাইনে সার্ভে খতিয়ান বের করার সম্পূর্ণ নিয়ম আলোচনা করা হয়েছে।
সার্ভে খতিয়ান কী?
ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত করা মালিকানা ও দখলের সরকারি রেকর্ডকে সার্ভে খতিয়ান বলে। প্রতিটি জরিপে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আয়তন, অবস্থান, মৌজা, দাগ নম্বর এবং মালিকের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একাধিকবার ভূমি জরিপ হয়েছে, এবং প্রতিটি জরিপের নিজস্ব নামে খতিয়ান তৈরি হয়েছে – যেমন CS, SA, RS এবং BS।
সকল প্রকার সার্ভে খতিয়ান সম্পর্কে জানুন
CS খতিয়ান (Cadastral Survey)
ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রথম জরিপ এটি। এই জরিপ কক্সবাজারের রামু থানা থেকে শুরু হয়ে দিনাজপুরে শেষ হয়। CS খতিয়ানে জমিদার ও প্রজার নাম আলাদাভাবে লেখা থাকে এবং এটি লম্বালম্বি ফরমেটে তৈরি।
SA খতিয়ান (State Acquisition)
পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে তৈরি এই খতিয়ান। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর অধীনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে এই জরিপ করা হয়। এটি PS বা MR নামেও পরিচিত।
RS খতিয়ান (Revisional Survey)
CS ও SA জরিপে যেসব ভুল-ত্রুটি ছিল, তা সরেজমিনে যাচাই করে সংশোধনের জন্য RS জরিপ করা হয়। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকায় ভূমি সংক্রান্ত কাজ এই RS খতিয়ান দিয়েই পরিচালিত হয়।
BS খতিয়ান (Bangladesh Survey)
১৯৯৮ সাল থেকে চলমান সর্বাধুনিক জরিপ এটি, যা বাংলাদেশ সার্ভে নামে পরিচিত। এতে তৈরি নকশা ও খতিয়ান তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নির্ভুল হিসেবে গৃহীত হয়।
সিটি জরিপ ও দিয়ারা জরিপ
শহর এলাকার জন্য আলাদাভাবে সিটি জরিপ (ঢাকা মহানগর জরিপ নামেও পরিচিত) এবং নদীর চর বা পয়স্তি ভূমির জন্য দিয়ারা জরিপ পরিচালিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ: জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে হলে CS থেকে শুরু করে সর্বশেষ জরিপ পর্যন্ত – প্রতিটি খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। শুধু সর্বশেষ খতিয়ান দেখে মালিকানার ইতিহাস সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
অনলাইনে সার্ভে খতিয়ান বের করার নিয়ম ২০২৬
১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। দুটি পোর্টালই ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অফিসিয়াল সাইট।
২: “সার্ভে খতিয়ান” অপশন নির্বাচন করুন
হোমপেজে “সার্ভে খতিয়ান অনুসন্ধান/নামজারি খতিয়ান/মৌজা মানচিত্র” মেনু থেকে সার্ভে খতিয়ান অপশনে ক্লিক করুন।
৩: বিভাগ, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করুন
জমি যে বিভাগে অবস্থিত তা নির্বাচন করুন, তারপর ধাপে ধাপে জেলা ও উপজেলা সিলেক্ট করুন।
৪: মৌজা ও খতিয়ানের ধরন নির্বাচন করুন
মৌজার নাম এবং কোন খতিয়ান দরকার (CS, SA, RS বা BS) সেটি নির্বাচন করুন।
৫: খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন
খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সরাসরি লিখে “খুঁজুন” বাটনে ক্লিক করুন। না থাকলে “অধিকতর অনুসন্ধান” অপশনে গিয়ে মালিকের নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজুন।
৬: খতিয়ানে ডাবল ক্লিক করে আবেদন করুন
খুঁজে পাওয়া খতিয়ানের উপর ডাবল ক্লিক করলে বিস্তারিত তথ্য দেখা যাবে এবং সেখান থেকেই সত্যায়িত কপির জন্য আবেদন করা যায়।
সার্ভে খতিয়ান কপির ফি ২০২৬
| কপির ধরন | ফি |
| QR কোডসহ অনলাইন/তাৎক্ষণিক কপি | ১২০ টাকা |
| সার্টিফাইড/সত্যায়িত কপি | ১২০ টাকা |
খতিয়ান খুঁজে না পেলে কী করবেন?
সার্ভে খতিয়ান অনুসন্ধানে কখনো কখনো তথ্য না পাওয়ার কারণ ও সমাধান:
নামের বানানে গরমিল: খতিয়ানে নাম ভিন্নভাবে লেখা থাকতে পারে। দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজে দেখুন।
ভুল জরিপ নির্বাচন: RS-এ না পেলে CS বা SA জরিপেও চেক করুন, কারণ এলাকাভেদে সর্বশেষ হালনাগাদ জরিপ ভিন্ন হতে পারে।
ডিজিটাইজেশন অসম্পূর্ণ: কিছু এলাকার পুরনো খতিয়ান এখনও সম্পূর্ণ ডিজিটাইজ হয়নি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস বা রেকর্ডরুমে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: বর্তমানে কোন খতিয়ান দিয়ে ভূমির কাজ পরিচালিত হয়?
উত্তর: বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকায় RS (Revisional Survey) খতিয়ান দিয়ে ভূমির কাজ পরিচালিত হয়। তবে যেসব এলাকায় BS জরিপ সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে BS খতিয়ান প্রাধান্য পায়।
প্রশ্ন: CS খতিয়ান কি এখনও প্রয়োজন হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। মালিকানার ধারাবাহিকতা (বায়া) প্রমাণের জন্য পুরনো CS ও SA খতিয়ানও প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষত দলিল রেজিস্ট্রি বা মামলার ক্ষেত্রে।
প্রশ্ন: সার্ভে খতিয়ান আর নামজারি খতিয়ানের পার্থক্য কী?
উত্তর: সার্ভে খতিয়ান সরকারি জরিপের রেকর্ড, আর নামজারি খতিয়ান হলো জমি হস্তান্তরের পর ভূমি অফিসে নতুন মালিকের নামে রেকর্ড আপডেট করার পর তৈরি খতিয়ান।
প্রশ্ন: BS খতিয়ান কবে থেকে চালু হয়েছে?
উত্তর: BS বা বাংলাদেশ সার্ভে ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হয়ে বর্তমানেও বিভিন্ন এলাকায় চলমান রয়েছে।
সার্ভে খতিয়ান বোঝা জমি কেনাবেচা ও মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। CS, SA, RS, BS – প্রতিটি খতিয়ান একটি নির্দিষ্ট সময়ের রেকর্ড বহন করে, এবং সম্পূর্ণ মালিকানা ইতিহাস বুঝতে এই ধারাবাহিকতা যাচাই করা জরুরি। সৌভাগ্যক্রমে ২০২৬ সালে এসে dlrms.land.gov.bd -এর মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়া এখন ঘরে বসেই সম্পন্ন করা সম্ভব।
সম্পর্কিত আর্টিকেল
মালিকের নাম দিয়ে সরাসরি যাচাই করতে চাইলে পড়ুন:
নাম দিয়ে জমির মালিকানা যাচাই ২০২৬
সার্ভে খতিয়ান হাতে পাওয়ার পর দলিল রেজিস্ট্রির ধাপ জানতে পড়ুন:
দলিল রেজিস্ট্রি করতে কী কী কাগজপত্র লাগে
সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া জানতে পড়ুন:

Pingback: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করার নিয়ম (২০২৬)