কেরানীগঞ্জে জমির দাম কেন কমবে না? জেনে নিন ৫টি বড় কারণ
ঢাকার রাস্তায় একবার বের হলেই বোঝা যায়, শহরটা এখন আর বৃদ্ধি পাওয়ার জায়গা পাচ্ছে না। ভবনের পাশে ভবন, গাড়ির পেছনে গাড়ি। নতুন করে বসবাসযোগ্য জমি প্রায় শেষ। তাই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে: ঢাকা এরপর কোন দিকে বাড়বে?
উত্তর খুঁজতে একটু পেছনে তাকানো যাক। একসময় উত্তরায় প্লট কেনার কথা বললে অনেকে বলতেন, “এত দূরে গিয়ে কী করবেন?” পূর্বাচল নিয়েও একই কথা শোনা যেত। আজ এই দুটি এলাকাই ঢাকার সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন এলাকার মধ্যে পড়ে। শহর যখন একদিকে আর বাড়তে পারে না, তখন সে অন্যদিকে ছড়ায়। উত্তর আর পূর্বে সেই ছড়িয়ে পড়া অনেকটাই হয়ে গেছে। এখন নজর পড়ছে পশ্চিমে, অর্থাৎ কেরানীগঞ্জ, বসিলা আর ঘাটারচর এলাকায়।
এই ব্লগে আমরা দেখব, কেরানীগঞ্জে জমির দাম কেন কমবে না এবং কোন ৫টি বড় কারণ এই এলাকার দামকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে।
এক নজরে ৫টি কারণ
১. রাজধানীর একদম নিকটবর্তী অবস্থান
২. যোগাযোগ ও বড় অবকাঠামোর পরিকল্পনা
৩. পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের বিস্তার
৪. ঢাকায় চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যহীনতা
৫. দ্রুত শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক হাব
১. রাজধানীর একদম নিকটবর্তী অবস্থান
রিয়েল এস্টেটের পুরোনো সূত্রটা সবারই জানা: দাম নির্ভর করে লোকেশনের ওপর। আর কেরানীগঞ্জের সবচেয়ে বড় শক্তি ঠিক এখানেই। মোহাম্মদপুর থেকে বসিলা ব্রিজ পার হলেই কেরানীগঞ্জ শুরু।
এর মানে, কর্মজীবনের সব সুবিধা হাতের কাছে থাকছে, অথচ বাড়ি ফেরা হচ্ছে তুলনামূলক খোলামেলা পরিবেশে। আর ঢাকার ভেতরে নতুন জমির জোগান যেহেতু প্রায় নেই, শহরের কাছের যে এলাকায় এখনো পরিকল্পিতভাবে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানে চাহিদা বাড়াই স্বাভাবিক।
২. যোগাযোগ ও বড় অবকাঠামোর পরিকল্পনা
একটি এলাকা তখনই আকর্ষণীয় হয়, যখন সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হয়। এদিক থেকে কেরানীগঞ্জের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে।
পদ্মা সেতু ও ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে:
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ঢাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। বরিশাল, খুলনা ও ফরিদপুরের পথে ঢাকায় ঢোকার সময় কেরানীগঞ্জ অনেকটা প্রবেশদ্বারের মতো। এতে এই এলাকায় বসবাস ও ব্যবসার আগ্রহ বেড়েছে।
প্রস্তাবিত ২৫০ ফুট ওয়েস্টার্ন বাইপাস:
ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ, দূরপাল্লার ভারী যান শহরের ভেতর দিয়েই চলে। বাইপাস বাস্তবায়িত হলে এসব যান শহরের বাইরে দিয়ে যেতে পারবে। এতে শহরের চাপ কমবে, আর বাইপাস-সংলগ্ন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়বে। সাধারণভাবে বড় সড়কের পাশের জমির মূল্য অন্য এলাকার তুলনায় দ্রুত বাড়ে।
ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে:
প্রস্তাবিত রুটটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নিমতলী ও কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে গেছে। তবে এখানে একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পর্যায়ে আছে, নির্মাণ শুরু হয়নি। তাই একে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত।
মেট্রো রেল লাইন-২ ও রেল যোগাযোগ:
ঢাকার পশ্চিম অংশকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা আছে। কেরানীগঞ্জে আগে থেকেই একটি রেলস্টেশন রয়েছে, যার কাছেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস। সড়ক, রেল ও গণপরিবহন, তিন মাধ্যমেই উন্নয়নের আলোচনা একসাথে চলছে, যা একটি এলাকার জন্য বেশ বিরল।
৩. আবাসন প্রকল্পের দ্রুত বিস্তার
যে এলাকায় একের পর এক পরিকল্পিত প্রকল্প গড়ে ওঠে, সেখানের বাজার ভবিষ্যৎ দেখছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। বসিলা-কেরানীগঞ্জ করিডোরে এখন ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি, মুক্তধারা সিটি ও মধু সিটির মতো একাধিক প্রকল্পের নাম শোনা যায়। পরিকল্পিত প্রকল্পে রাস্তা, ড্রেনেজ ও নাগরিক সুবিধার জন্য আগে থেকেই জায়গা রাখা হয়, ফলে এলোমেলো নগরায়নের সমস্যা অনেকটা এড়ানো যায়।
শিক্ষা: এই অঞ্চলে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (UODA), ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, সাউথ ব্রিজ স্কুল এবং আকিজ ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর সাথে তেঘরিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ একরের নতুন ক্যাম্পাসের কাজ এগোচ্ছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু শিক্ষার্থী নয়। শিক্ষক, কর্মচারী, দোকানদার, পরিবহনকর্মী, সবাইকে নিয়ে একটি পুরো অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়। তাদের থাকার জায়গা ও নিত্যসেবার চাহিদা জমির বাজারেও প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্যসেবা: পরিবার নিয়ে থাকার সিদ্ধান্তে হাসপাতালের নৈকট্য বড় ভূমিকা রাখে। প্রস্তাবিত পপুলার মেডিকেল কলেজ ও ইবনে সিনা হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান এলাকার স্বাস্থ্যসেবা ধীরে ধীরে শক্ত করছে।
৪. ঢাকায় চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যহীনতা
এখানে অর্থনীতির সবচেয়ে সরল নিয়মটি খাটে: জোগান সীমিত, চাহিদা বাড়ছে। প্রতিদিন কাজ, পড়াশোনা ও ব্যবসার জন্য নতুন মানুষ ঢাকায় আসছে। কিন্তু শহরের ভেতরে নতুন বাসযোগ্য জমি বের করার সুযোগ প্রায় নেই। যাদের বাজেট শহরের ভেতরের দামের সাথে মেলে না, তারা আশপাশের পরিকল্পিত এলাকার দিকে ঝুঁকছেন।
পশ্চিম ঢাকা এই চাহিদার একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প, কারণ এখানে শহরের নৈকট্যও আছে, আবার পরিকল্পিত প্লট পাওয়ার সুযোগও আছে। জোগান সীমিত আর চাহিদা ধারাবাহিক হলে দীর্ঘমেয়াদে দাম স্থিতিশীল থাকা বা বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
৫. দ্রুত শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক হাব
কেরানীগঞ্জ একসময় মূলত গার্মেন্টস কারখানা আর কাপড়ের বাজারের জন্য পরিচিত ছিল। এখন সেই পরিচয় বদলাচ্ছে। উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ঢাকার পশ্চিম অঞ্চল। বাইপাস ও এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হলে এলাকাটি লজিস্টিক, গুদাম, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও শপিং কমপ্লেক্সের সক্রিয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
আর যেখানে কাজের সুযোগ বাড়ে, সেখানে মানুষ থাকতে চায়। বসবাসের চাহিদা বাড়লে আবাসিক ও বাণিজ্যিক জমির মূল্যও বাড়ে। এই চক্রই একটি এলাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।
এই সম্ভাবনার কেন্দ্রে ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি
এই অবস্থান, যোগাযোগ ও ইকোসিস্টেমের একটি বাস্তব উদাহরণ কেরানীগঞ্জের নিমতলী রোডে গড়ে ওঠা ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি।প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গা জুড়ে এই প্রকল্প মোহাম্মদপুর থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে, আর ২০১১ সাল থেকে ম্যাক্সওয়েল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান Maxwell Homes & Properties এটি পরিচালনা করে আসছে। প্রস্তাবিত ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের রুটও এই নিমতলী এলাকা দিয়েই পরিকল্পিত, যা এর অবস্থানগত গুরুত্ব আরও বাড়ায়।
এখানে আবাসিক প্লট পাওয়া যায় ৩, ৪, ৫, ১০ ও ১৫ কাঠার মধ্যে, আর বাণিজ্যিক জোনে আছে ২০ থেকে ৭০+ কাঠা পর্যন্ত প্লটের সুবিধা। প্রকল্পটি সাজানো ৫০ ও ৮০ ফুট প্রশস্ত এভিনিউ রোড ও ২০-২৫ ফুটের সংযোগ সড়ক দিয়ে, আর ভেতরে আছে কমিউনিটি সেন্টার, জিমনেসিয়াম, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং মল, শিশুদের খেলার মাঠ ও লেক। সাথে আছে ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদী কিস্তি সুবিধা, যা বিনিয়োগ শুরু করাকে সহজ করে তোলে।
শেষ কথা
ঢাকার পরবর্তী গ্রোথ ফেজ কোথায় হবে, তা শেষ পর্যন্ত সময়ই বলে দেবে। তবে কোনো উদীয়মান এলাকাকে বুঝতে হলে শুধু আজকের অবস্থা দেখলে চলে না। দেখতে হয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, যোগাযোগের গতিপথ আর বাস্তব উন্নয়নের গতি। এই তিন মাপকাঠিতেই কেরানীগঞ্জ আজ বেশ এগিয়ে।
আপনি যদি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান, তাহলে একবার নিজে প্রকল্প এলাকায় ঘুরে আসুন।
